কেন ঘৃণিত আওরঙ্গজেব?

ডাঃ আবু সঈদ আহমেদ:

আমরা পরীক্ষার জন্য ইতিহাস বই পড়ি। তাতে ভারত ইতিহাসের অন্যান্য অধ্যায়ের মত মুঘল আমলের কথাও থাকে। বইয়ের পাতায় বা নোটের খাতায় জ্বাজল্যমান হয়ে ওঠে দেশপ্রেমিক স্বাধীনতাকামী ‘রাণা প্রতাপ’, ‘শিবাজি’ আর ‘তেগ বাহাদুর’ দের নাম আর কালো অক্ষরে লেখা হয় ‘ভাতৃঘাতী’, ‘পিতাকে বন্দী করা’, ‘হিন্দুবিদ্বেষী’ বিশেষণে লাঞ্ছিত আওরঙ্গজেবের কথা। এখন দেখা যাক কে ছিলেন এই আওরঙ্গজেব আর কেনই বা তিনি এত ঘৃণিত।

পিতার সুনজর থেকে বঞ্চিত
পঞ্চম মুঘল সম্রাট শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র ছিলেন আবুল মুজাফ্ফার শিহাবুদ্দিন আওরঙ্গজেব। শাহ জাহানের অন্যান্য পুত্রকন্যাদের মধ্যে দারা শিকোহ, সুজা, মুরাদ, রৌশন আরা এবং জাহান আরাদের নাম ইতিহাসখ্যাত। আওরঙ্গজেবের উপস্থিতিতে এক দুর্ঘটনায় তাঁর বোনের মুখে আগুন লাগে। শাহজাহান মনে করতেন আওরঙ্গজেব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেন নি। এরপর থেকে আওরঙ্গজেব, শাহজাহানের বিশেষ সুনজরে ছিলেন না। তিনি তাঁর কাছে দারা শিকোহকেই বেশি রাখতেন আর আওরঙ্গজেবকে মধ্য এশিয়াসহ নানা দুঃসাহসিক অভিযানে পাঠাতেন।

কম বয়সেই বীর হিসাবে সুখ্যাতি
যুবরাজ থাকা অবস্থাতেই আওরঙ্গজেব নিজেকে বিপন্ন করেও এক কুচকাওয়াজের সময় ‘সুধাকর’ নামে মত্ত হয়ে ওঠা হাতিকে রুখে দেন। এছাড়াও শাহজাদা আওরঙ্গজেবের সেনার কাছে শিবাজির নবোত্থিত মারাঠা বাহিনী পরাজিত হয়েছিল। যেরকম ভাবে যুবরাজ দারা শিকোহ উপনিষদ ও সুফিবাদের তুলনামূলক আলোচনা ‘মাজমাউল বাহরায়ন’ (দুই সাগরের মিলনস্থল) রচনাসহ নানা আধ্যাত্মিক কাজে কৃতবিদ্য হোন তেমনি আওরঙ্গজেব তাঁর সামরিক ও প্রাশাসনিক কাজে কৃতিত্ব দেখান। এছাড়া তিনি দাদা দারাশিকোহর মত না হলেও বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা অর্জন করেন।

whatsapp-image-2016-09-27-at-6-56-29-pm-3

ক্ষমতা দখল
১৬৫৮ সালে শাহজাহানের অসুস্থতার সময় তার ছেলেদের মধ্যে ক্ষমতা দখলের জন্য ততপরতা দেখা যায়। ক্ষমতার ধর্মই মানুষকে উগ্র করে তোলা, এর জন্য মানুষকে নিজের জীবন বিপন্ন করতে, নিজেদের প্রিয়জনকে ক্ষতি করতে বহুবার দেখা গেছে। এরজন্য আওরঙ্গজেবকে ব্যতিক্রমী মনে করার কোন কারণ নেই। সামুগড়ের লড়াইয়ে পরাজিত দারাশিকোহকে কাজীপরিষদ ধর্মত্যাগের অপরাধে এবং আওরঙ্গজেবের একদা সহযোগী মুরাদকে যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সুজা আরাকানরাজ্যে আশ্রয় নেন। অসুস্থ শাহজাহানকে রৌশন আরা এবং জাহান আরার সাহচর্যে রাখা হয় যেখান থেকে তিনি তাঁর প্রিয়ার স্মৃতি তাজমহল দেখতে পেতেন।

শত্রু দমন
গৃহযুদ্ধজয়ী আওরঙ্গজেব উত্তরাধিকার সুত্রে পান এক আলিশান সাম্রাজ্য ও পূর্বসূরীদের ফেলে আসা বহু অমীমাংসিত সমস্যা। এরফলে বেশ কিছু শত্রু দমন করে কাবেরীকূল অবধি পৌঁছলেও বাকি অংশ থেকে যায় অধরা। মুঘল সাম্রাজ্য ছিল একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে এক সামন্ত ও ক্ষুদ্র রাজতন্ত্রীদের জোট। এই জোটের অন্যতম ভিত্তি ছিল মনসবদারী ও জায়গীরদারী প্রথা। মুঘলবাহিনীতে গোলন্দাজ ব্যতিরেকে প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রিত বাহিনী বিশেষ ছিলনা। মুঘলবাহিনী দিন দিন স্থবির হয়ে পড়ছিল। এরপর কোন মুঘল সম্রাটের পক্ষেই উত্তরোত্তর বাড়তে থাকা সমস্যা সামাল দেওয়া সম্ভব ছিল না, আওরংজেবের ক্ষমতা দখলের অনেক আগে থেকেই জাঠ, শিখ, মারাঠা, ইংরেজ, পর্তুগীজরা মুঘলবৈরিতা শুরু করে, এমনকি ঔরঙ্গজেবকে পারস্য-আফগান (আফগান সীমান্ত ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায়)-দক্ষিণি (বিজাপুর-গোলকুণ্ডা) মুসলিমদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ চালাতে হয়েছে। ঔরঙ্গজেব কিছু শত্রুকে দমন করলেও মারাঠা-শিখ-ইংরেজ এই তিন শত্রু নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ
আওরঙ্গজেব ইংরেজদের অনৈতিক ফরমান পাওয়ার আর্জি নাকচ করে দিলে ১৬৮৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী চাইল্ড এর যুদ্ধ শুরু করে যাতে তারা শোচনীয় ভাবে পর্যুদস্ত হয়। যদিও এর প্রস্তুতি ১৬৮৫ তে নিকোলসনের যুদ্ধযাত্রার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল। এমনকি হুগলিতে গুলি চালানোর পাশাপাশি ৫০০ টি ঘর জ্বালিয়ে দেয় ইংরেজরা। ১৬৮৮ তে হজযাত্রীদের আটকে আওরঙ্গজেবকে চাপে ফেলে। বম্বে ও দাক্ষিণাত্যে অপরাজেয় জঞ্জিরা জলদুর্গ থেকে হাবসী জাহাজি সিদি ইয়াকুবের নৌবাহিনী ইংরেজদের বিধ্বস্ত করে। ব্রিটিশ নিরস্ত হতে বাধ্য হয়। বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খানও আক্রমণ চালান। ব্রিটিশ দূত নতজানু হয়ে ক্ষমা চায়।
The_English_ask_pardon_of_Aurangzeb

এরপর জোব চার্ণক বাংলার সুতানটী, গোবিন্দপুর ও কলিকাতায় বাণিজ্যঘাঁটি গড়ে যা আজকের কলকাতা মহানগর। এরপরেও ১৬৯৫ সালে ইংরেজ জলদস্যু হেনরী আভেরি হজযাত্রী জাহাজ গঞ্জ-এ-সাওয়াই ও ফতেহ মুহাম্মাদ -এ লুঠ, খুন ও ধর্ষণ করে। এই ঘটনায় আরেক কুখ্যাত জলদস্যু টমাস টিউ নিহত হয়। প্রত্যুত্তরে আওরঙ্গজেব
ইংরেজদের ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে এবং আভেরিকে গ্রেফ্তারের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করান। ১৭০২ সালে দাউদ খান পান্নি মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গ অবরোধ করে টমাস পিটকে সমঝোতায় আস্তে বাধ্য করান।

ঔরঙ্গজেবকে ঘৃণিত চরিত্র হিসেবে তুলে ধরতে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র

বারবার আওরঙ্গজেবের কাছে পর্যুদস্ত হওয়ায় ব্রিটিশরা আওরঙ্গজেবকে ভালো চোখে দেখত না। ফলে তাঁরা রাজনৈতিক কারণে মন্দির ভাঙা নিয়েই গলা চড়িয়েছেন, আর আওরঙ্গজেবের সাহায্যপ্রাপ্ত মন্দিরের বিষয়ে নীরব থেকেছে। ধর্মান্তরিত হতে না চাওয়া (যার প্রথম উল্লেখ ঘটনার অন্তত ১০০ বছর পর হয়) তেগ বাহাদুরের মৃত্যুদন্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, অথচ তেগ বাহাদুর আর হাফিজ আদম মানুষের ওপর কর বসিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করেছিলেন তা আর চোখে পড়েনি। জিজিয়া করকে তীর্থকর বলে পাঠ্যবইয়ে চেপে বসিয়েছেন, কিন্তু ‘জিজিয়া’ শব্দের এক অর্থ ‘কর’ বা এই করপ্রদানের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষম অমুসলিমদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হত আর শিশু,বৃদ্ধ, মহিলা, পঙ্গু, ভিক্ষু, দাস ও মানসিক রোগীদের থেকে নেওয়া হত না সেসব বেমালুম চেপে গেছেন। খুব কম ঐতিহাসিকই জানিয়েছেন, ১৬৭৯ তে প্রতিরক্ষা খরচ বেড়ে গেলে রাজত্বের ২১ বছর পর এই কর চালু করেন; আবার ১৭০৪ এ দাক্ষিণাত্যে অর্থনৈতিক সংকটের সময় এই কর প্রত্যাহৃত হয়েছিল।

এইভাবে আওরঙ্গজেবকে ঘিরে ভুল ধারণা বয়ে চলছে। প্রকৃতপক্ষে আওরঙ্গজেব কালের গতিকে থামিয়ে দিতে পারেন নি, হয়ত পলাশীর মত যুদ্ধ ১৬৮৮ তেই হত সেটা আওরঙ্গজেব কেবল পিছিয়ে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই সত্যিটা জানা দরকার।

Please follow and like us:

9 thoughts on “কেন ঘৃণিত আওরঙ্গজেব?

  1. ঔরঙগজেব এর ইংরেজ বিরোধীতা এবং বারবার ঔরঙগজেব এর কাছে পরাজিত হবার কারণে ‘জনগনমন অধিনায়ক ভারতের ভাগ্যবিধাতা ” ‘ইংরেজ দের ভালো লাগে নি। তারা তাদের ঐতিহাসিক দের দিয়ে ঔরঙগজেবের বীরত্ব, সার্বভৌমত্ব রক্ষক মহানুভব শাসকের তকমা মুছে দিতে সচেষ্ট হয়। ইংরেজ দের গবেষণা গারে মিথ্যা ইতিহাস রচনা করা হয়।
    ইংরেজ ঐতিহাসিকরা তো ছিলই। সঙ্গে ছিল যদুনাথ সরকারের মতো দেশীয় ঐতিহাসিক। ইংরেজ দের সহযোগিতা করার জন্য ইনি ইংরেজ দের কাছ থেকে টাকা এবং ” স্যার ” উপাধি পেয়েছিলেন। সেই মিথ্যা ইতিহাস বর্তমান এ গেরুয়া ঐতিহাসিক দের হাতের ছোঁয়ায় আরো জীবন্ত হয়ে উঠেছে!!

    1. গেরুয়া ব্রিগেডের ইংরেজ অনুরাগে আজ আওরংজেব সড়ক মুছে গেছে।

  2. আওরঙ্গজেবের সমাধি রয়েছে মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদের কাছে খুলদাবাদে
    খোলা আাকাশের নিচে সাদামাটা কবর, তার উপর রয়েছে একটা বন তুলসি গাছ।
    এই হল ভারতের সর্বাধিক এলাকা শাসনকারী সম্রাটের অন্তিম শয্যা। যা রচনা করতে তাঁর পিতার খরচ হয় ২২ লক্ষ টাকা। আরআওরঙ্গজেবের মাত্র ১৪ টাকা।

    1. অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা চৌধুরী সাহেবকে। আসলে আওরংজেবকে নিয়ে অনেক তথ্যই দেবার ছিল। দেওয়া গেলনা লেখাটি অনেক বড় হয়ে যাবে বলে।

  3. লেখা অতি চমৎকার তথ্যবহুল সন্দেহ নেই। তবে ভাষাগত দিকটি খেয়াল রাখা উচিত ছিলো। সর্বোপরি আওরঙ্গজেব আলমগিরকে নিয়ে এই কাজটি হোক ভবিষ্যতের আরো বড়ো কিছুর প্রেরণা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *