ভাঙড় আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা

ইনকিলাব ডেস্ক:
সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক গগণে নতুন ঝঞ্ঝা হিসেবে উঠে এসেছে ভাঙড়। তবে নির্বাচন পরবর্তী হিংসা বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা কোন নেতার দলবদলের জন্য নয়, এক পাওয়ার গ্রীড প্রকল্পকে ঘিরে অসন্তোষ, বিক্ষোভ এমনকি দুই তরুণের প্রাণহানিও ঘটেছে এখানে। ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি, মাওবাদী যোগ ইত্যাদি অনেক কথাই ভেসে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। আসুন একটু খতিয়ে দেখা যাক।
কেন এই আন্দোলন?
এই আন্দোলনের প্রথম কারণ, পাওয়ার গ্রিডের জন্য জমি অধিগ্রহণে স্বচ্ছতা অবলম্বন করা হয়নি। এমনকি এও শোনা গেছে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্থানীয় মানুষের জীবিকা হবে প্রচার করে জমি নিয়ে পাওয়ার গ্রিড করা হয়েছে। গ্রেফ্তার হওয়া শঙ্কর দাস বলেছেন,

“রাজারহাটে এই প্রকল্প হলে জমির দাম পড়ে যেত। তাতে চলতে থাকা প্রমোটর রাজের অসুবিধা হত। তাই ভাঙড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

দ্বিতীয় কারণ, বহুফসলি জমির ওপর বিদ্যুতের বৃহদায়তন স্তম্ভ বসানো হয়েছে। এর ফলে জমির মূল্যমান এবং চাষযোগ্যতা থাকেনা। উপরন্তু জমি অধিগ্রহণ না করে সামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে কাজ সারা হয়েছে। এর সঙ্গে শাসক দল ও পুলিশের ভূমিকাতেও এলাকাবাসীর আপত্তি দেখা গেছে। পাওয়ার গ্রীড কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞাপনে খুঁটির নীচে বসতি বা চাষাবাদে নিষেধাজ্ঞা আরো বেশি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে
তৃতীয় কারণ, ইনসুলেটর হিসেবে সালফার হেক্সাফ্লুরাইড নামের বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার, যা পার্শ্ববর্তী চাষের জমি ও মাছের ভেড়ির জন্য ক্ষতিকর। বিজ্ঞানী নিশা বিশ্বাসের গবেষণাতে উঠে এসেছে এই তথ্য।
চতুর্থ কারণ,
ভাঙড়বাসী আজিম শেখসহ অনেকেই বলেছেন, উন্নয়ন যদি করতেই হয় তাহলে এলাকার বেহাল রাস্তা সারানো হোক। এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বড় অভাব, সেই বিষয়গুলো দেখা হোক। বিদ্যতের যখন এতই দরকার তখন পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো হোক।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকার
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বারবার “জনগণ না চাইলে পাওয়ারগ্রীড হবে না” দাবি করলেও বেলাগাম ধরপাকড় এবং বিক্ষোভ সামলাতে গিয়ে দুই যুবকের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরো ঘোরালো করে তুলেছে। এখন এই মামলায় সরকার সন্ত্রাসদমনবিধি UAPA জারি করেছে। ভাঙড়ে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শর্মিষ্ঠা চৌধুরী এবং সিপিআই (এমএল-রেড স্টার) নেতা প্রদীপ সিং ঠাকুরসহ কলকাতায় সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব
দানকারী মজদুর ক্রান্তি পরিষদএর কুশল দেবনাথ এবং শঙ্কর দাসকেও এই প্রক্রিয়ায় গ্রেফ্তার করা হয়েছে। খড়দা থেকে এসে আন্দোলনকে সংগঠিত করা অলীক চক্রবর্তী এখনো অধরা। এই প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বিষয় নিয়ে মুখর সুজাত ভদ্র বলেছেন,

“আমরা UAPAকে সমর্থন করিনা। আর ভাঙরের গণ আন্দোলন মোকাবিলায় এই দমনমূলক আইনের প্রয়োগ একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়।”

খুব আশ্চর্যের সাথে দেখা গেছে, যাঁরা পাথর ছুঁড়ে মারার ফতওয়া দিয়ে খবরের শিরোনামে আসেন বা মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণে শেখ হাসিনার আগমন নিয়ে আপত্তি তোলেন,ওয়াকফ তাঁরা বিক্ষোভদমন প্রক্রিয়ায় মসজিদ আক্রান্ত হলেও বিশেষ তর্জনগর্জন করেন নি।
এই আন্দোলনে ওয়াকফ জমি বেদখল নিয়ে প্রতিবাদ করলে সংখ্যালঘু তোষণের সুযোগে মুসলিমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে এই জাতীয় অপপ্রচার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি, এটাও কম বড় প্রাপ্তি নয়।
আন্দোলন থেকে শিক্ষা
এই আন্দোলন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা সাহস করে লড়াইয়ে নামলে যেকোন সন্ত্রাসকে মোকাবিলা করা যায়। দ্বিতীয় শিক্ষা, নিষ্ঠাভরে লড়াই চালিয়ে গেলে বিকিয়ে যাওয়া মিডিয়াও গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়। তৃতীয় শিক্ষা প্রতিটি স্তরের মানুষের আইনি সচেতনতা দরকার।
সত্যগোপনে মিডিয়ার স্বার্থ
২০১৪ সাল থেকেই হঠাৎ করে মিডিয়ার গেরুয়াপ্রীতি বেড়ে গেছে। ভাঙ্গড়ের প্রকৃত ঘটনা সামনে এলে মিডিয়াপ্রচারিত মোদি-মমতা যুদ্ধপ্রহসন বড় ধাক্কা খেত। অন্যদিকে যতই পূর্ণিয়া থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে আসার কথা বলা হোক না কেন, এই পাওয়ার গ্রীড বাংলাদেশের সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল প্রকল্পেরই বিস্তৃত থাবা, এটা মনে না করার কোন কারণ নেই। মোদি-মমতা-হাসিনা আঁতাত যত কম আলোচিত হবে, ততই কিছু লোকের সুবিধা। ভাঙ্গড়ের গ্রামবাসীদের লড়াই মমতা ব্যানার্জির মুসলিম দরদের মিথে বড়সড় চিড়।
আন্দোলন যা পারেনি
যেসব গ্রামে এই আন্দোলন চলছিল সেই গ্রামে সাক্ষরতার প্রসার ছিল সীমিত। গ্রামবাসীদের মধ্যে সচেতনতা প্রসারের জন্য সাক্ষরতার বিস্তারও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই আন্দোলন সেইদিকে এগোতে পারেনি। এই আন্দোলনে পরিবেশচেতনা একটা বড়দিক ছিল। সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ উত্পাদনের জন্য শ্বেতকয়লা বা সৌরশক্তির মত বিকল্প পদ্ধতির ব্যবহার, সালফার হেক্সাফ্লুরাইডের অপকারিতার কথা ভেসে এলেও সেই বক্তব্য খুব জোরালো প্রতিষ্ঠা পায়নি। মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান অপপ্রচারের সামনেও বড় দুর্বল মনে হয়েছে এই আন্দোলনকে। রাজ্যের অন্য অংশের মানুষ এই আন্দোলনের সত্যতা প্রায় কিছুই জানতে পারেন নি।
আরো কিছু কথা
স্বাধীনতার পর থেকেই দেখা গেছে, উদ্বাস্তু সমস্যা-জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য কারণ বশত কলকাতা শহরের খিদে মেটাতে বলি চড়ানো হয়েছে আশেপাশের জলাজমি, মাছের ভেড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট ছোট গ্রামগুলোকে। সল্টলেক, রাজারহাট থেকে যাদব্পুর-নরেন্দ্রপুর-সোনারপুর একই ছবি বারবার উঠে আসে। ভাঙড় সেই তালিকায় আরো এক সংযোজন। তাই পরিবেশবান্ধব জায়গাসাশ্রয়ী উন্নয়ন চিন্তা চাই, চাই আরো যুগোপযোগী নগর এবং আবাসন পরিকল্পনা।

Please follow and like us:

3 thoughts on “ভাঙড় আন্দোলন: একটি পর্যালোচনা

  1. মৃত্যু দুটি নিয়ে সত্যিই মর্মাহত। জমি নিয়ে ক্ষোভও সঙ্গত। তবে পাওয়ার গ্রিড সরানোর বিষয়টি যেন অন্যরকম। আন্দোলনটি জনপ্রিয়তা হারানোর কারণও এটাই। কারণ অনেকেই বলছেন অলিক বাবু গং মোবাইল চার্জ কি দিয়ে করেন? সেই বিদ্যুতও তো কোন পাওয়ার গ্রিডের।

    1. ১) আন্দোলন জনপ্রিয়তা হারায়নি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য স্থগিত আছে।
      ২) এই নিবন্ধের “কেন এই আন্দোলন” অংশটি আরো একবার পড়বার অনুরোধ করছি।
      ৩) sanhati.com এ বিজ্ঞানী নিশা বিশ্বাসের প্রবন্ধ পড়ে নিতে পারেন।

    2. অাপনার এটা ভাবা উচিত যে …মানুষের জন্য উন্নয়ন , মানুষকে ক্ষতি করে নয় ৷ অাপনি এমন একটি জায়গা দেখান যেখানে এত বিপুল জনবসতির মাঝে এত বড় (৪৪০)kv পাওয়ার গ্রিড তৈরী হয়েছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *