বাস্তব সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতেই কি ২২লাখী আস্ফালন ?

বাংলার মুসলিমদের অনেক সংগঠন দেখা যায়। এমনকি পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রীও মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে মাঝে মধ্যে হিজাব পড়েন, ইদের জামাতে শামিল হোন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়শই তাঁকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সবকিছুর জন্য দায়ী করে বিষোদগার করতে দেখা যায়। আবার মুখ্যমন্ত্রীকে শিরচ্ছেদ করার জন্য ১১লক্ষ টাকা দেবার কথা বললে, কেউ কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বক্তার মাথার জন্য দিগুণ অংকের পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন(দুটি ঘটনায় সমানভাবে নিন্দনীয়)। ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গকারী লর্ড কার্জন অফ কেডলস্টনকে কার্জন অফ খিদিলস্তান আখ্যা দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।
তবুও কখনো সখনো ফাঁকফোকল গলে মুসলিমদের অসন্তোষের কথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কখনো তারেক ফাতাহকে তাড়াবার ডাক দিয়ে, কখনো মুজিবের মুর্তি উচ্ছেদের ডাক দিয়ে, কখনো ভাঙড়ের ওয়াকফ সম্পত্তির বিষয়ে, কখনো বা বিচারধীন মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন নিয়ে। এখন দেখে নেওয়া যাক, কারা এই অসন্তুষ্ট অকৃতজ্ঞ জনগন যাদের এত তোষণ পেয়েও মন ভরেনা?

সমস্যা ও নেতৃত্ব
মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন ভারতীয় সংবিধানের ৩০ক ধারায় উল্লিখিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানোর অধিকারকে অবমাননা করছে, এই দাবি তুলে দীর্ঘদিন মামলা চলছিল। ফলে সেখানে নিয়োগও বন্ধ ছিল। ফল ভুগতে হয়েছে সাধারণ প্রার্থীদের। অথচ যাঁরা পাথরছোঁড়া বা ২২লাখি ফতোয়া দেন তাঁদের সাড়া পাওয়া যায়নি।। তেমনই ভাঙড়ের ওয়াকফ সম্পত্তি জবরদখলের সময় তাঁরা চুপ করেছিলেন। নীরব থেকেছেন সেখানে মসজিদ ভাঙা পড়বার সময়েও।  শোনা যায়, এককালে ইসলামের অবমাননাকারী বিদেশী লেখিকাকে বিতাড়নের জন্য রাস্তা দাপিয়ে বেড়ানো এক নেতা নাকি তাঁর দলনেত্রীকে দেবী সরস্বতীর সাথে তুলনা করেছেন। তার মানে তিনি কি বলতে চাইছেন যে তিনি বহুদেবতায় বিশ্বাসী না সরস্বতীর মত তিনি তাঁর দলনেত্রীতেও অবিশ্বাসী? তারেক ফাতাহকে বিতাড়নের ডাক কার্যত তারেক ফাতাহর পরিচিতি বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে যেখানে রুটি-রুজির প্রশ্নই মেটেনি সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণের বিরোধিতা, মুজিবমুর্তি অপসারণের দাবি কার্যত প্রাণশক্তির অপচয়। আর কুরআনের ১৭নং সুরা ‘আল-ইসরা’ বা ‘বনি ইজরাইল’ এর ২৭ নং আয়াতে অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই বলে উল্লেখ করা আছে।

প্রগতিশীল-মুক্তমনা ইত্যাদি

অন্যদিকে প্রগতিশীলদের নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাঁরা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সপক্ষে সওয়াল করেন। কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতে গোমাংস বৈধতা এবং বাকি ভারতে গোমাংসে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কি অভিন্নতা খুঁজে পান, তা জানা যায়নি। অন্যদিকে ভারতীয় দন্ডবিধি থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে জাতীয় বিধি লাগু কেন করা হয়, সেই প্রশ্নও তুলতে খুব বেশী দেখা যায় না। তাঁরা দাবী করেন, তাঁরা নারী-পুরুষের সমানাধিকারের পক্ষে লড়ছেন। কিন্তু ভারতীয় দন্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় ‘ব্যভিচারিণী স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাবেনা’, বয়ানের মধ্যে সমানাধিকার কেমন করে সুরক্ষিত থাকে তার সদুত্তর তাঁদের কাছে পাওয়া যায় না। তাঁরা দাবি করেন সমস্ত বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়া আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিৎ, কিন্তু যে বিচারব্যবস্থায় দুকোটিরও বেশি মামলা চলছে, তার সংস্কার না করলে কি করে কুপ্রথার শিকার নারীদের সহায় হবে সেইপ্রশ্নে নিরুত্তর থাকেন তাঁরা। বিভিন্ন কর্মনিয়োগ প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা চলছে। এইসব নিয়েও মুক্তমনারা বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে নজরে আসেনি।

অযোগ্য নেতৃত্বের কুফল

মধ্যযুগে মুসলিম সমাজ জ্ঞানবিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল। এই জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল আজকের ইরান, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ এবং রাশিয়া, আজারবাইজানের কিছু অংশ জুড়ে থাকা খোয়ারিজম। বীজগণিতের প্রণেতা মুহাম্মাদ আল-মুসা আল-খোয়ারেজমী এখানকারই মানুষ ছিলেন। এই খোয়ারিজমের সম্রাট শাহ আলাউদ্দীন মহম্মদের কাছে মঙ্গোল যোদ্ধা চেঙ্গিজ খান একাধিকবার বাণিজ্যের বার্তা নিয়ে দূত পাঠিয়ে ব্যর্থ হোন। এমনকি চেঙ্গিজের পাঠানো মুসলিম দূতের মুন্ডচ্ছেদ করে ফেরত পাঠান শাহ। ফলে মঙ্গোল আক্রমণে খোয়ারিজম রাজ্যের সাড়ে বারো লক্ষ মানুষ নিহত হোন, যা ছিল সেই সময়কার জনসংখ্যার একচতুর্থাংশ। সাথে সাথে ধ্বংস হয় অজস্র জ্ঞানবিজ্ঞানের গ্রন্থ ও চর্চাকেন্দ্র। ক্রমে সেইসময়কার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র বাগদাদেরও পতন ঘটে। অযোগ্য নেতৃত্বের ফলে জাতীয় পতন কিভাবে জনসাধারণের দুর্ভোগ ডেকে আনে তার অজস্র উদাহরণ আছে জোসেফাসের জেরুজালেম, মুসলিম স্পেন, হিটলারের জার্মানির মধ্যে।

তাই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা আজ কারো কাছে নিজেদের দেশরক্ষাব্রত, কারো কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা জাহির করার ছুতো হয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত উচ্চাকাংখার সিঁড়ি হয়ে আছেন।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *