গণভোট, তুর্কি নওরোজ ও আতাতুর্কের “সমাধি”রচনা

 

আহমেদ সাদাত তানভির

ভোটের ফল হোক বা আবহাওয়া, সবসময় যা আশা করা হয় তা হয় না। বেশিরভাগ সময়েই চিরাচরিত ধারণাকে হার মানিয়ে দেয় বাস্তব ফলাফল। তবে এক্ষেত্রে তুরস্ক একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হতে পারে। সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমে দেয়া ফলাফলের পূর্বাভাস একদম ষোলআনা প্রতিফলিত হয়েছে ষোল এপ্রিলের গণভোটে। গণরায়ের মাধ্যমে এককালের ইস্তাম্বুলের মহানগরীর মহানাগরিক এখন পুরো তুরস্কের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

গণভোটের প্রয়োজনীয়তা কেন?

তুরস্ককে বিদেশি আধিপত্য হতে মুক্ত করা হতে শুরু করে আধুনিক তুরস্ক গঠনে প্রয়োজনীয় সংস্কারে মুস্তাফা কেমালের অবদান অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে তিনি সত্যিই “আতাতুর্ক”! কিন্তু আতাতুর্কের তুরস্ক “ইওরোপের রুগ্ন মানুষ” না হলেও “তটিনীর মতো চঞ্চল”ও ছিল না। পাশ্চাত্য সমর্থনপুষ্ট সেনাবাহিনী দেশটির সরকার, সংবিধান এবং বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় নিজের ইচ্ছেমত হস্তক্ষেপ করতে পারত। প্রধানমন্ত্রীকিংবা অন্যান্য মন্ত্রী-এমপিদের সেনা আজ্ঞাবহ হয়েই কাজ করতে হত। রাষ্ট্রপতি পদটি কেবল আলঙ্কারিক ছিল। দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে জরুরি সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারটুকুও ছিল না পদাধিকারীর। সেনাবাহিনী ও পাশ্চাত্য এক হয়ে তুরস্কের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করত। সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছে দেশটি।

কিন্তু এখন সে রাহুর দশা কেটে গেছে। তুরস্ক এখন পাশ্চাত্যের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শিখেছে। নিজে বুঝে নিতে শুরু করেছে নিজের দায়িত্ব। নিজ দেশের সেনাবাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে পেরেছে। জনতা খালি গায়ে উদ্যত ট্যাংককে ঠেকিয়ে দিচ্ছে। এই বাস্তবতাকেই পাশ্চাত্যের সামনে পরিবেশন করার জন্য প্রয়োজন ছিল এ গণভোটের।

তবে এ পথ মসৃণ নয়

নতুন কিছু করতে হলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তেই হবে। এ গণভোটের ক্ষেত্রেও এমনটিই হয়েছে। ২০০৭ এর গণভোটও এতোটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। ওই গণভোটের পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার বিধান করা হয়। এতে সরকার হোক বা বিরোধীপক্ষ- কেউ তেমন একটা চ্যালেঞ্জ করেনি। কিন্তু ষোলই এপ্রিলের গণভোট ছড়িয়ে দিচ্ছিল উত্তাপ-উত্তেজনা। সেয়ানে সেয়ানে চলেছে “হ্যাঁ” বনাম “না” সমর্থকদের প্রচারণা। “না” ভোটের পক্ষে প্রধান বিরোধীদল সিএইচপি, আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল এইচডিপি ছাড়াও ক্ষমতাসীনদের সাথে জোটভুক্ত এমএইচপি দলের একটি অংশও প্রচারণা চালিয়েছে। এলিট পেশাজীবি ও সামাজিক সংগঠনগুলোও ছিল “না” ভোটের পক্ষে। বিপরীতক্রমে, “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে অনেকটা একাই প্রচারণা চালাতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দল একেপিকে। ভোট হয়ে যাবার পর বিরোধীপক্ষের নানা অনিয়মের অভিযোগও ছিল। এরদোয়ান খুবই অল্প ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। শহরাঞ্চলের এলিট জনগোষ্ঠীর মাঝে তার পক্ষে সমর্থন ছিল হতাশাজনক। যে ইস্তাম্বুলের মহানাগরিক হয়ে তার রাজনীতিতে উত্থান, সেখানে “না” ভোটই পড়েছে ৫১.৪ শতাংশ। অন্যান্য মহানগরীতেও “না” এর জয়জয়কার।

তবে অবাক করার বিষয় হল, পুরো ইওরোপ ও ইওরোপীয় মিডিয়া তুর্কি গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া সত্ত্বেওইওরোপ প্রবাসী তুর্কিরা ব্যাপকহারে ভোট দিয়েছে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে। তুর্কি প্রবাসীদের সবচেয়ে বেশি আধিক্য জার্মানিতে। সেখানে প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোট পড়েছে “হ্যাঁ” এর ঘরে। “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে যাওয়া তুর্কি দুই মন্ত্রীকে বিমানবন্দর হতে ফিরিয়ে দেবার মত ঘটনা ঘটেছে যে দুটো দেশে, সেই নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামে সর্বোচ্চ পরিমাণ “হ্যাঁ” ভোটের জয়জয়কার শোনা গেছে।

গণভোটের ফল ও “তুর্কি নওরোজ”

নওরোজ মানে নববসন্ত। কিন্তু গণভোটেরফল সত্যিই তুরস্কের জন্য নববসন্ত বয়ে এনেছে কি না তা জানতে হলে তেমন অপেক্ষা করার দরকার হবে না। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসপরিক্রমা ঘাঁটলেই এর জবাব অনেকটাই পাওয়া যাবে।

প্রজাতন্ত্র গঠনের পর ইওরোপীয় ধাঁচের বর্ণবাদ পেয়ে বসেছিল তুরস্ককে। তুর্কি ছাড়া অন্য কোনও জাতি, ভাষা বা সংস্কৃতি সহ্য করা হবে না- এমন বর্ণবাদও সংযুক্ত করা হয় তুর্কি সংবিধানে। সেনাবাহিনীকে দেয়া হয় সকল জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে বিশেষ ক্ষমতা। হুট করে কোনও প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি এসে বর্ণবাদবিহীন সাম্যবাদী হয়ে জনতার কথা ভাবতেই সেনাবাহিনী পশ্চিমের প্রেসক্রিপশন মেনে অভ্যুত্থান এনে “পবিত্র” সংবিধানকে বাঁচিয়ে দেশরক্ষা করত। ফলশ্রুতিতে জন্ম হয় নতুন এক তুরস্কের। সাপের বিষ প্রতিরোধের উপায় জানা থাকলেও যার জানা ছিল না মশা-মাছির হাত থেকে বাঁচার উপায়। পশ্চিমা শক্তিও নিজেদের ঔপনিবেশিক ফরমেটে তৈরি এমন এক তুরস্ক দেখতেই অভ্যস্ত ছিল। তবে সব সমীকরণ পাল্টে দিয়ে এরদোয়ানের ক্যারিশম্যাটিক ভূমিকা তুরস্ককে বিশ্বদরবারে মুখাপেক্ষী হয়ে বসিয়ে না রেখে, বিশ্বকেই তুরস্কের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। সেনাবাহিনী ও এলিট আমলাদের হাতে থাকা জবাবদিহিতাবিহীন ক্ষমতার লাগাম শক্ত করেই চেপে ধরা হয়েছে। তুর্কিদের জন্য এ এক নওরোজই বটে! কেবল নওরোজকে বরণ করার জন্য প্রয়োজন ছিল গণভোট। সেটাতেও পাল্লা ভারী “হ্যাঁ” এর দিকেই।

স্বৈরাচারের পদধ্বনি

গণরায়ে এরদোয়ানের এহেন বিজয়ের পর তুরস্কে অনেকেই শুনতে পাচ্ছেন স্বৈরাচারের পদধ্বনি। তবে মজার ব্যাপার হলো, এরদোয়ানকে “স্বৈরাচার” বলা হলে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা অনেক দেশকেই স্বৈরাচারের দেশ বলা চলে। কারণ এসব দেশে রাষ্ট্রপতিই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। ক্ষমতাসীন দল পার্লামেন্টে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন দখল করলে সেসব দেশে রাষ্ট্রপতি হয়ে পড়েন সকল জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। সেখানে তুরস্ক সংশোধিত আইনে সুযোগ রেখেছে যে কোনও অবস্থায় সাংবিধানিক আদালত দ্বারা রাষ্ট্রপতিকে জবাবদিহিতার সামনে আনার, বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর।

 

এরপরও অনেক বিশ্লেষক ও মিডিয়ার অভিযোগ, তুরস্ক গণতন্ত্র হতে হাঁটছে স্বৈরাচারের পথে। বিরোধীপক্ষও একই ধরণের অভিযোগ করেছে ভোটের আগে। জনতার মাঝে প্রচার করা হয়েছে “না” ভোট দিলে চিরাচরিত তুর্কি গণতন্ত্র অক্ষুণ্ণ থাকবে। গত জুলাইয়ের সেনা অভ্যুত্থানের পর নির্বিচারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ, চাকরিচ্যুতি ও ডিটেনশন দেবার ঘটনাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে এরদোয়ান স্বৈরাচারী আচরণ করছেন সেসব সাধারণ মানুষের সাথে, যারা রাজপথে নেমে উদ্যত সেনাদের ঠেকিয়ে দিয়েছিল। বড় করে তুলে ধরা হয়েছে ২০১৩তে ইস্তাম্বুলের তাকসিম স্কয়ারে পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ দমনের ঘটনাকেও।

তবে গণভোটে এ ধরণের প্রচারের প্রভাব শহরাঞ্চলের অভিজাতদের মাঝে বেশি কার্যকরী হলেও গ্রামাঞ্চলে কিংবা কৃষক-শ্রমিকদের মাঝে কার্যকর হয়নি।

হয়তো “স্বৈরাচারী” এরদোয়ানের একচ্ছত্র ক্ষমতাবান হওয়ার মাঝেই তারা খুঁজে পেয়েছে নিজেদের উজ্জ্বলতর ভবিষ্যৎ!

গণভোট ও আতাতুর্কের “সমাধি” প্রসঙ্গ

মুস্তাফা কেমাল পাশা। যাকে বলা হয়ে থাকে আধুনিক তুরস্কের বরপুত্র। তবে বহুমাত্রিক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও নিজের হঠকারী সিদ্ধান্তকে আইন করে চাপিয়ে দেয়াতে তার জুড়ি ছিল না। একদা তুরস্কে তার মুখের কথাকেই অপরিবর্তনীয়, অলিখিত আইন হিসেবে বাস্তবায়ন করা হত। সে আইন জনতার মঙ্গলের জন্য হোক-কিংবা অমঙ্গল ডেকে আনুক, কোনও কিছুই বিবেচনা করা হতো না। সেনাবাহিনীও এ আইনকে রক্ষার জন্য প্রাণপণে লড়ে যেত নিজ দেশের জনগণের বিপক্ষেই।

এই অবস্থায় মহাপরিবর্তন আসে এরদোয়ানের সময়ে। হত্যার হুমকি কিংবা অপরিমেয় সম্পত্তির লোভকে অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই এরদোয়ান বাধ্য করেন তুরস্ককে ঘুরে তাকাতে। শ্রেণীকক্ষের তথাকথিত সুবোধ বালকটির মতো এককোণে পড়ে থাকা তুরস্ককে সবচেয়ে সক্রিয় করে তুলে ধরেন সবার কাছে। হঠকারিতামূলক অনেক আইন বাতিলের পদক্ষেপও নেন। কিন্তু বাঁধ সাধে সেনানিয়ন্ত্রিত ও পশ্চিমা প্রভাবিত সাংবিধানিক আদালত। সাংবিধানিক আদালতের নির্দেশে ধামাচাপা পড়ে যায় মহতী উদ্যোগসমূহ। আর যেসব উদ্যোগ আদালতের রক্তচক্ষু অতিক্রম করতে পারে, সেগুলো ধামাচাপা পড়ে যায় অভিজাত আমলাচক্রের ফাঁদে পড়ে। স্বার্থ হাসিল হয় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের প্রতিনিধিদের। মূলতঃ এসব সীমা অতিক্রম করার জন্যই প্রয়োজন ছিল আরেকটি বিপ্লবের। রক্তপাতহীন সে গণবিপ্লবে জয়ী এরদোয়ান। পাশ্চাত্য, সেনাবাহিনী ও অভিজাতচক্রের ত্রিমুখী হঠকারিতার দিন ফুরোনোর পথে, যা শুরু হয়েছিল সেই কেমালের সময়কালে।

অতএব গণভোটের ফলাফলকে একরকম আতাতুর্কের “সমাধি” রচনাই বলা চলে। কিন্তু এ সমাধি সাধারণ জনতার বুকের ওপর পা দিয়ে ঊর্ধ্বপানে হেঁটে চলা অভিজাতদের হঠকারিতার সমাধি। সংস্কার কিংবা দূরদৃষ্টির সমাধি রচনা নয়।

Please follow and like us:

One thought on “গণভোট, তুর্কি নওরোজ ও আতাতুর্কের “সমাধি”রচনা

  1. লেখকের নামটা আহমেদ সাদাত তানভির হবে। আর লেখাটি “এই মুহূর্তে” সাময়িকীতে প্রকাশিত কথাটি উল্লেখ করলে ভালো হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *