ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসঃ এক ঝলক

ইরান একসময় সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্র হলেও মোঙ্গল আক্রমণ পরবর্তী কালে সাফাভি শাসনের পর শিয়া শাসনাধীন হয়। এই সাফাভি শাসকেরা ছিলেন তুর্কী বংশোদ্ভূত এবং পরিবারে তুর্কিতেই কথা বলতেন। তাঁরা পারস্যের অতীত গৌরবে ফেরাতে না পারলেওযথেষ্ট শক্তিসালী সাম্রাজ্য তৈরি করেন।
এই তুর্কীভাষী সাফাভিদের সাথে প্রতিবেশী আরও তুর্কীভাষী সাম্রাজ্য ওটোমান ও মুঘলদের সম্পর্ক সেরকম ভালো ছিলনা। উত্তরে মধ্য এশিয়ার রাজ্যগুলির সাথে ছিল ব্যপক শত্রুতা। প্রাচ্যে ইউরোপীয় বণিকদের বাড়বাড়ন্তের জন্য এই শত্রুতাও দায়ী।
সাফাভি সম্রাট তামাস্প মুঘল স্ম্রাট হুমায়ুনকে শেরশাহের আক্রমণকালে আশ্রয় দেন। তার প্রভাব পরবর্তী মুঘলদের আচরণ-সংস্কৃতি-স্থাপত্য-সাহিত্য-রণনীতিতে পড়েছিল। একসময় সেই সাফাভি বংশের শাসন শেষ হয়।
নাদির শাহি ও অন্যান্য কাজার বংশীয় সম্রাটদের রাজত্ব শেষে ১৯২৫সালে রেজা শাহ পাহল্বী ক্ষমতা দখল করেন। তুরস্কের কামাল পাশা ও আফগানিস্থানের আমানুল্লাহর মত তিনি কিছু সংস্কার করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর অক্ষশক্তিকে সমর্থন করলে ইং-সোভিয়েত হানায় তাঁর গদি যায়।
বিজয়ী মিত্রপক্ষ ইয়ল্টার মত ইয়ল্টা-পতসড্যামের মত ইরানের রাজধানী তেহরানে রাষ্ট্রপ্রধানদের সভা করে। মিত্রপক্ষ রেজা শাহের পুত্রকে ক্ষমতা দিয়ে ইরান ত্যাগ করে। তিনি পশ্চিমী সাহায্যে কমিউনিস্ট প্রভাব থামান, তবে আজার বাইজান প্রদেশ চলে যায় সোভিয়েতে।
এরপর আরবদেশগুলি ও তুরস্কের মত ইরানেও কুর্দদের উষ্মা বাড়তে থাকে। ১৯৫৩তে তৈলসম্পদ জাতীয়করণে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদেগকে Operation Ajax সামরিক অভ্যুত্থানে সরিয়ে দেয় মার্কিন মদতপুষ্ট জেনারেল ফাজলোল্লাহ জাহেদীর সেনা।
এই সময় ইরান পরমাণু প্রকল্পে হাত দেয়, তাতে পশ্চিমারা বিশেষ আপত্তি করেনি। ১৯৭৩ এর তৈলসঙ্কটে ইরান পশ্চিমী দেশগুলিকে বিপুল তেল বিক্রী করে।  শাহের সহযোগিতায় পশ্চিমা শক্তিগুলি কমিউনিজমের প্রভাব ঠেকাতে  Safari Club  তৈরি করে। এই ঘটনায় ফ্রান্সের আলেক্জান্দ্রে দে মারেঞ্চেস, সৌদি আরবের কামাল আদামের পাশাপাশি ইরান এর গুপ্তবাহিনী সাভাক এর নেমাতোল্লাহ নাসরীর ষড়যন্ত্র ছিল। প্রকাশ্যে শত্রুতা করে গেলেও মার্কিন স্বার্থে ইজরায়েল এবং সৌদি আরব হাত মেলায় ইরানের সাথে। সোমালিয়ায় অশান্তি ছড়াতে এবং মিশর-ইজরায়েল চুক্তি করতে এই আঁতাতের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

ক্রমবর্ধমান অসন্তোষে ১৯৭৯এ ইরানের রাজতন্ত্রের পতন হয়। এই ঘটনায় শিয়াপন্থী দল্গুলির মত বামেরাও সক্রিয় ছিল। তেলখনির জাতীয়করণ পশ্চিমীমহলে ব্যপক উষ্মা তৈরি করে। ১৯৮০তে ততকালীন মার্কিন মিত্র ইরাকের সাদ্দাম হুসাইন ইরান আক্রমণ করেন।
ইরানের নয়াসরকারেও ব্যপক বিক্ষোভ দেখা যায়। বামদল্গুলি এবং সুন্নি মসজিদ নিষিদ্ধ হয়। দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৮২তে সাদ্দামের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবও খারিজ হয়ে যায়। আটবছরের ধ্বংসের পর শেষ হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধ।
ইরান ব্যপক অর্থনৈতিক অবরোধ স্বত্ত্বেও প্রযুক্তিগত উন্নতি করেছে। ২০০৩ এ মার্কিন হামলায় সাদ্দামের পতন হলে ইরাকের নয়া শিয়াশাসকের ওপর ব্যপক প্রভাব বিস্তার করেন ইরানের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনিজাদ।
সিরীয়া, লেবানন সরকার ও অন্যান্য কিছুদেশের রাজনৈতিক দল্গুলির ওপরও ইরান সরকারের প্রভাব আছে। সিরীয়ার গৃহযুদ্ধ, দায়েশের উত্থান, তুরস্ক অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি ইরানের ভূমিকা নিতে সহায়ক হয়েছে।ইরানে কুর্দ-বালুচ ও অন্যান্য বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যপক দমননীতি জারিও আছে। দেশে নির্বাচিত সরকার থাকলেও আয়াতুল্লাহদের হুকুমই চূড়ান্ত।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *