পলাশির বিপর্যয়:স্বাধীনতা হারানোর এক বেদনাদায়ক স্মারক ও আজকের ভাবনা

পলা‌শির প্রান্ত‌রে রক্তক্ষ‌য়ী সেই সংঘ‌র্ষের কথা স্মরণ ক‌রে টাইমস্ বাংলার বি‌শেষ নিবন্ধ,এইচ.ইউ.ফারুক এর কল‌মে: ২৩শে জুন আমাদের ইতিহাসের মহাবিপর্যয়ের বেদনাদায়ক স্মারক দিবস।আজ থেকে ২৬০ বছর পূর্বে১৭৫৭সালের ঠিক এই ২৩শে জুনেই পলাশির আমবাগানে  কুচক্রী দালালদের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলা তথা দেশের স্বাধীনতা সূর্য অস্ত যায়।দেশের ভাগ্যাকাশে নেমে আসে সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের কালোমেঘ।সেদিন নবাবের বাহিনিতে ৫০হাজার পদাতিক,১৫হাজার অশ্বারোহী সৈন্য এবং ৫৩টি কামান।ইংরেজ বাহিনিতে ৯শো তোপসী, আর ২ হাজার দেশি সিপাই।শুরু হল যুদ্ধ ,কিন্তু এতো যুদ্ধ নয়,প্রহসন। তরুণ নবাব অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর বাহিনির ৪৫ হাজার সৈন্যই বিশ্বাসঘাতক সেনানায়কদের অধীনে।কিন্ত মীর মর্দান-মোহন লাল সহ অনেক নিবেদিত প্রাণ দেশপ্রেমিক সৈন্য লড়াই করে যাচ্ছিল।তাদের সম্মিলিত আক্রমণে ইংরেজ সৈন্য পিছু হটছিলো।আর সেই মুহূর্তে এল অবিরাম বৃষ্টি।সেনাপতি পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক নবাবকে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দিলে নবাব তা মেনেনিলেন।নবাব যড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেন কিন্ত তখন অনেক দেরি হয়েগেছে।পলাশিতে নবাবের পরাজয় নাকি বিপর্যয় এই নিয়ে ঐতিহাসিক দের মধ্য বিতর্ক থাকতে পারে। তবে আমারা সবাই জানি,পলাশির ময়দানে কোন যুদ্ধের ফলে নয়,আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম এক অবিশ্বাস্য চক্রান্ত ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্য।বাংলার নবাব কে পরাজিত করার জন্য ষড়যন্ত্রের চিত্র নাট্য রচনা করেন রবার্ট ক্লাইভ।আর তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দেন     জগৎশেঠ,উমিচাঁদ,রায়দুর্লভ,রাজবল্লভ প্রমুখ।নবাব এই জগৎশেঠ দের খুবই বিশ্বাস করতেন।নবাব সে সময় বাংলার দেওয়ান,তনদেওয়ান,বকশী প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সাত টি পদে হিন্দুদের বসিয়েছিলেন।সারা বাংলায় তখন ১৯ জন জমিদার ছিলেন তার মধ্যে ১৮ জন হিন্দু।কিন্তু জগৎশেঠ,রাজবল্লভ,কৃষ্ণচন্দ্র প্রমুখ এই ক্ষমতার উপর ভর করেই নবাব কে পরাজিত করার ষড়যন্ত্রে ক্লাইভের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।যদিওপলাশির যুদ্ধের প্রধান খলনায়ক হিসেবে মীরজাফর কে প্রচার করা হলেও যড়যন্ত্রের মূল হোতা সে নয়।তাঁকে শিখন্ডী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।পলাশির চক্রান্ত ছিল মূলত ভারতে মুসলিম শাসন ব্যবস্থার পতনের এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত।ক্রুসেডের যুদ্ধে মুসলিমদের হাতে পরাজিত হয়ে ইউরোপীয় খ্রিস্টান শক্তি পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশ গ্রাস করার পরিকল্পনা করে।ভারতবর্ষে এই উদ্দেশ্যেই পর্তুগিজ,ফরাসি ও ইংরেজ এই তিন শক্তি এসেছিল।কিন্তুএদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় ইংরেজরা টিকে যায়।আর এদেশে ইংরেজরা হিন্দু বণিক ও জমিদারদের সহযোগী হিসেবে পেয়ে যায়।তাই ইংরেজ দের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়ে এদেশের মুসলমানরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন হায়দার আলী,টিপু সুলতান,মীর নিশার আলী,শরীয়তুল্লাহ,দুদু মিয়া,আহমদ বেরেলভী,শাহ ইসমাইল শহিদ প্রমুখ।পরবর্তীতে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ পর্যন্ত এই একশো বছর মুসলমানরা  ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলন জারি রাখে।আর জগৎশেঠ দের লক্ষ্য ছিলো কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলে এদেশ থেকে মুসলিম শাসন উচ্ছেদ করা।তাই তারা ইংরেজদের অন্যতম সহযোগী হিসেবে সরকারি পদ অধিকার করে নানা সুযোগ সুবিধা আদায় করে নেয়।আর মুসলিমরা প্রবল ইংরেজ বিদ্বেষ বশত পাশ্চাত্য অনুসরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

আজও এদেশে ক্লাইভ ও জগৎশেঠ দের উত্তরসূরীরা বর্তমান।বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় তা লাভ করেছে স্থায়ী অবয়ব।আর সেই জন্যই তো ক্লাইভের উত্তরসূরী ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিন  এদেশে পালন করতে দেখা যায় জগৎশেঠ দের উত্তরসূরীদের।তাই আজকের ক্লাইভ-জগৎশেঠদের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজন মীর মর্দান-মোহনলালের শুভ শক্তির বজ্রকঠিন লড়াই,প্রতিরোধ।হিন্দু-মুসলিম সহ সকল ভারতবাসীর সম্মিলিত দেশপ্রেমের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক এক জাতিগত ঐক্য।এই সম্মিলিত ঐক্যের মাধ্যমে আমরা গড়ে তুলব এক উন্নত,শক্তিশালী ভারতবর্ষ।যে ভারতবর্ষ শিক্ষা দীক্ষা,জ্ঞান বিজ্ঞান,তথ্য প্রযুক্তিতে সমগ্র বিশ্বকে পথ দেখাবে।কোন বিদেশি শক্তি ভারতকে চোখ রাঙানোর দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।পলাশির পুনরাবৃত্তি আর নয়।আজকের সিরাজেরা আর সেই ভুল করবে না, বিশ্বাসঘাতকের কথায় লড়াই বন্ধ করবে না যতই বৃষ্টি,তুফান আসুক।পলাশির হিমরাত নয় সোনালী সূর্যের আগমণ সুনিশ্চিত করতে আমরা সকল ভারতীয় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই টাইমস্ বাংলা ম‌নে ক‌রে দে‌শের জরাজীর্ণ ইতিহাস‌কে সাম‌নে রে‌খেই ‘ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *